নিজস্ব প্রতিবেদক: নারী পুনর্জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ১৪৫তম জন্ম ও ৯৩তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠী) উপজেলায় পাঁচটি ক্যাটাগরিতে পাঁচজন সফল নারীকে ‘অদম্য নারী’ সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। সোমবার (৯ ডিসেম্বর) বেলা ১১টায় উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আয়োজনে এ সম্মাননা প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমিত দত্ত। উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) রায়হান মাহমুদ, আরডিএ কর্মকর্তা মাহবুবুল হাসান শিবলী, কৃষি কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমানসহ ছাত্র প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী
বলদিয়া ইউনিয়নের বিন্না গ্রামের মোসাঃ নিলুফা ইয়াসমিন এ ক্যাটাগরিতে সম্মাননা পান। অল্প বয়সে বিয়ে, পারিবারিক অস্বচ্ছলতা ও বাবার মৃত্যুর পর নানা বাধা সত্ত্বেও স্বামীর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাড়িতে বসেই খেলাধুলার সামগ্রী বিশেষ করে ক্রিকেট ব্যাট তৈরি শুরু করেন তিনি। নিজের উদ্যোগে ব্যাট তৈরির কাঁচামাল ও গুণগত মান সম্পর্কে দক্ষতা অর্জন করে বাজারে ভালো অবস্থান তৈরি করেন। বিদেশেও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন নিলুফা।
শিক্ষা ও চাকরিতে সাফল্য
আটঘর-কুড়িয়ানা ইউনিয়নের সুলতানপুর গ্রামের প্রিয়ংকা হালদার শিক্ষা ও চাকরিতে সাফল্যের জন্য অদম্য নারী সম্মাননা পেয়েছেন। লোহার দোকানি পিতার সংসারে অর্থকষ্ট থাকা সত্ত্বেও তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে টিউশনির পাশাপাশি চাকরির প্রস্তুতি নিয়ে ৪০তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে এবং ৪১তম বিসিএসে বন ক্যাডারে নিয়োগ পান। বর্তমানে তিনি সাতক্ষীরায় বন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত।
সফল জননী
স্বরূপকাঠী পৌরসভার মোছাঃ রিনা বেগম ‘সফল জননী’ হিসেবে সম্মাননা লাভ করেন। অল্প বয়সে বিয়ে ও তিন সন্তানের জন্মের পর স্বামীর স্বল্প আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। বাড়িতে মুরগির খামার দিয়ে তিনি অতিরিক্ত আয়ের পথ তৈরি করেন। ধীরে ধীরে সেই আয় থেকে সন্তানদের শিক্ষায় বিনিয়োগ করেন এবং স্বামীকে উপজেলা সদর এলাকায় একটি ভাতের হোটেল করতে সহযোগিতা করেন। তার বড় ছেলে কলেজের প্রভাষক, দ্বিতীয় ছেলে ডাচ-বাংলা ব্যাংকে কর্মরত এবং ছোট ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেছে।
জীবন সংগ্রামে জয়ী নারী
মধ্য করফা গ্রামের শিবানী হালদারকে জীবনের দুঃস্বপ্ন পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। স্বামী মারা যাওয়ার পর শ্বশুরবাড়িতে নির্যাতনের মুখে তিনি ছোট সন্তানের সাথে বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন। পরে নিজ উদ্যোগে চায়ের দোকান ও কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন এবং মেয়েকে বড় করে নিজের পায়ে দাঁড় করান। এখন তিনি নতুন উদ্যমে নিজের জীবন পরিচালনা করছেন।
সমাজ উন্নয়নে অবদান
গুয়ারেখা ইউনিয়নের মিলি রানী সুতার সমাজ উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকার জন্য অদম্য নারী হিসেবে মনোনীত হন। বাবার মৃত্যুতে পড়াশোনা ঝুঁকিতে পড়লেও তিনি পরিবার সামলে সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত হন। বাল্যবিবাহ রোধ, প্রতিবন্ধীদের সহায়তা, মাদকবিরোধী উঠান বৈঠক, ঝরে পড়া রোধসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। বাল্যবিবাহ রোধে একটি কমিটি গঠন করেন এবং মহিলা পরিষদের কাজেও যুক্ত হন। বর্তমানে তিনি গুয়ারেখা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য।
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মনিকা আক্তার জানান, নেছারাবাদের নারীরা যে প্রতিকূলতার মধ্যেও সাফল্য অর্জন করছেন, অদম্য নারী সম্মাননা তাদের সেই সংগ্রাম ও অর্জনের স্বীকৃতি।
