পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলায় সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে একসাথে তিন কন্যা সন্তানের জন্ম হয়েছে এক দিনমজুর পরিবারের ঘরে। তবে জন্মের পর নবজাতক তিনটিকে দেখে শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেড় হাজার টাকা ফি নেওয়ায় বিষয়টি স্থানীয়ভাবে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
জানা গেছে, উপজেলার বালিহারী গ্রামের দিনমজুর ও বিদ্যুৎ মিস্ত্রি মো. শরিফুল ইসলাম উজ্জ্বলের স্ত্রী মোসা. নুসরাত জাহান গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর উপজেলার একটি প্রাইভেট হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে একসাথে তিনটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। জন্মের সময় নবজাতক তিনটি স্বাভাবিক থাকলেও স্বজনরা উদ্বিগ্ন হয়ে শিশুদের ওই হাসপাতালের নিচতলায় চেম্বার করা শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মো. হোসাইন আহমেদের কাছে নিয়ে যান। ডা. হোসাইন আহমেদ শিশু তিনটিকে দেখে জনপ্রতি ৫০০ টাকা করে মোট এক হাজার পাঁচশত টাকা ফি নেন। এসময় দিনমজুর উজ্জ্বল কিছুটা কম নেওয়ার অনুরোধ জানালেও নির্ধারিত ফি অনুযায়ী তিন নবজাতকের জন্য পুরো অর্থই নেওয়া হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ডা. মো. হোসাইন আহমেদ মুন্সিগঞ্জ থেকে প্রতি সপ্তাহে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার নেছারাবাদের ওই প্রাইভেট হাসপাতালে এসে নবজাতক, শিশু ও কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে রোগী দেখেন। হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা মোসা. শারমিন নামে এক কর্মী জানান, তিনি শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং তার ফি জনপ্রতি ৫০০ টাকা।
হাসপাতালের সামনে টাঙানো একটি ফ্লেক্স ব্যানারে দেখা যায়, ডা. মো. হোসাইন আহমেদ নবজাতক, শিশু ও কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে রোগী দেখার পাশাপাশি মানবদেহের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন বলে উল্লেখ রয়েছে। ব্যানারে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), ডিডিএইচ (শিশু স্বাস্থ্য) এবং কর্মস্থল হিসেবে মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের কনসালটেন্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যানারে উল্লিখিত তার সেবাসমুহ দেখলে যেকারো মনে পারে মানবদেহে যত প্রকার রোগ থাকুকনা কেন এই এক ডাক্তারেই যেন সমাধান।
নুসরাত জাহানের স্বামী মো. শরিফুল ইসলাম উজ্জ্বল বলেন, “মহান আল্লাহ আমাদের ঘরে একসাথে তিনটি মেয়ে সন্তান দিয়েছেন, এতে আমি খুব খুশি। আমি পেশায় একজন বিদ্যুৎ মিস্ত্রি। বাচ্চাদের জন্মের পর শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে দেখাতে হয়েছে, এজন্য দেড় হাজার টাকা দিতে হয়েছে। আল্লাহর রহমতে স্ত্রী ও সন্তানরা এখন কিছুটা সুস্থ আছে। তবে হাসপাতালের খরচ ও বাচ্চাদের পরিচর্যা নিয়ে একটু দুশ্চিন্তায় আছি।”
নেছারাবাদ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান বলেন, “ডাক্তারি কেবল একটি পেশা নয়; এটি একটি মানবিক দায়িত্বও। একজন চিকিৎসকের উচিত রোগীর কষ্ট বোঝা, আন্তরিকতার সঙ্গে সেবা দেওয়া, সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করা এবং প্রয়োজনে অন্য বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো মানবিকতা ও উদারতা।” তিনি আরও বলেন, “দিনমজুর পরিবারের কাছ থেকে এভাবে ফি নেওয়াটা ঠিক হয়নি।”
এদিকে দিনমজুর পরিবারের ঘরে একসাথে তিন সন্তানের জন্মের খবর পেয়ে নেছারাবাদ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মেহেদী হাসান হাসপাতালে গিয়ে নবজাতকদের জন্য উপহার নিয়ে আসেন। তিনি বলেন, “দিনমজুরের ঘরে একসাথে তিনটি সন্তান জন্ম নেওয়া যেমন আনন্দের, তেমনি এটি পরিবারের জন্য দুশ্চিন্তার বিষয়ও। জন্মের পর চিকিৎসক নবজাতকদের দেখে সামান্য চিকিৎসা দিয়েছেন, কিন্তু এমন ক্ষেত্রে কিছুটা মানবিক হওয়া উচিত ছিল।”
এদিকে একসাথে তিন কন্যা সন্তানের জন্মে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে গেলেও মা ও নবজাতকদের চিকিৎসা ও পরিচর্যার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে পরিবারটি।
নুসরাত জাহানের শ্বশুর মো. মোজাম্মেল মিয়া বলেন, “আমার ছেলের বিয়ের পর এটাই প্রথম সন্তান। একসাথে তিনটি নাতনি হওয়ায় আমরা খুব খুশি। তবে আমার ছেলে দিনমজুর হওয়ায় চিকিৎসা ও পরিচর্যার খরচ নিয়ে কিছুটা চিন্তায় আছি।”
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সন্ধ্যায় উপজেলার ইন্দুরহাটে অবস্থিত একটি ক্লিনিকে তিন সন্তানের জন্ম হয়।
