পরিবারের জন্যই রাজনীতি সবচেয়ে বেশি নিষ্ঠুর- এ কথাই মনে হয়। আত্মীয়-স্বজনহীন মানুষের জন্যই বুঝি এই দেশের রাজনীতি সবচেয়ে বেশি ‘পারফেক্ট’। কারণ রাজনীতির এই নিষ্ঠুর বাস্তবতায় যাদের হারানোর কিছু নেই। তাদের ক্ষতিও তুলনামূলক কম। সম্প্রতি একটি সংবাদ পড়ে আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। হয়তো অনেকেই বিশ্বাস করবেন না। আমার চোখের পানি সহজে পড়ে না। কিন্তু বাগেরহাটের সেই সংবাদটি এক নিমিষেই হয়তো যে কোন পাষন্ড হৃদয়কে নরম করে দেয়।
বর্তমান সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের স্থানীয় এক সভাপতির স্ত্রী মাত্র তেইশ বছর বয়সী এক তরুণী নিজের নয় মাসের শিশুসন্তানকে সঙ্গে নিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। আত্মহননের পথ লিখছি সংবাদপত্রে পাওয়া তার পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ি। সংবাদে লেখা হয়েছে, এক পাশে মায়ের জুলন্ত মরদেহ, অন্য পাশে নিষ্পাপ শিশুর নিথর দেহ। এই দৃশ্য কেবল সংবাদ নয়, এ যেন এক জীবন্ত অভিশাপ। এটা কার অভিশাপ কিসের অভিশাপ?
পরিবারের ভাষ্যমতে, স্বামী সাদ্দাম একাধিক রাজনৈতিক মামলায় কারাবন্দি হওয়ার পর থেকেই তার স্ত্রী চরম হতাশায় ভুগছিলেন। সেই হতাশাই হয়তো শেষ পর্যন্ত এই ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। সাদ্দামকে জেলের ভেতর বসেই দেখতে হয়েছে স্ত্রী ও সন্তানের মৃতদেহ। তরুনি মা ও শিশু সন্তানকে দেয়া হয়েছে পাশাপাশি কবর। এমন দৃশ্য কল্পনাই যথেষ্ট একজন মানুষকে ভেঙে দেওয়ার জন্য। রাজনীতি কিসের জন্য করি। কেন করি। তাই আবারও বলছি রাজনীতি সবার জন্য নয়।
গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দেখা দেশের চলমান রাজনীতি থেকে আরও একটি কথা মনে হচ্ছে। এদেশের রাজনীতির পালা বদলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে দলের ছোট খাট কর্মী এবং পদধারি ছোট খাট নেতারা। যেখানে বড় নেতাদের সংখ্যা যত সামন্য। কিন্তু দিন শেষে ক্ষমতা আসলে সবচেয়ে লাভবানও হচ্ছে ওই সুবিধাবাদি বড় বড় কথিত নেতারা। দলের দু:খের সময়ে যাদের ধারে কাছেও পাওয়া যায়না।
আমি জানি না, সাদ্দামের অপরাধ কতটুকু। সংবাদমাধ্যমে যতদূর জানা যায়, তার নামে কোনো খুনের মামলা নেই৷ আছে রাজনৈতিক মামলা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক দায় কি পরিবারকে এমন মাশুল দিতে বাধ্য করে? যা পূর্বেও করেছে। আগেই বলছি এটা নতুন নয়। চলমান ধারায় হয়ে আসছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, এমন ঘটনা এই প্রথম নয়। অতীতেও আমরা দেখেছি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে কত যুবক আর ঘরে ফেরেনি। কত পরিবার আজও অপেক্ষা করে প্রিয় মুখটির জন্য। থাক আর বলবোনা। তখন শুনতাম “বিএনপি-জামায়াতের প্রেতাত্মা”; এখন বেশি বললে হয়তো শুনতে হবে“দোসরের লোক”। মুল কথা হল শব্দ বদলায়, যন্ত্রণা বদলায় না; এই দেশের রাজনীতিতে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বারবার একই চিত্র ফিরে আসে। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, প্রতিহিংসা আর সংঘাতের আগুনে পুড়ে যায় পরিবার। কোথাও স্বামী হারায় স্ত্রী ও সন্তান, স্ত্রী হারায় স্বামী, কোথাও সন্তান হারায় বাবা-মা, আবার কোথাও শিশুদের চোখের সামনে রক্তাক্ত হন তাদের অভিভাবক। এসব দৃশ্য দেখা বা শোনা কোনো সংবেদনশীল মানুষের পক্ষেই সহ্য করা সম্ভব নয়।
এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমি কষ্টের সঙ্গে বলছি, যাদের পেছনে কোনো পরিবার নেই, যাদের হারানোর কিছু নেই, তাদের জন্য চলমান ধারার এই রাজনীতি তুলনামূলকভাবে ‘সহজ’ ও ‘নিরাপদ’। কিন্তু যাদের ঘরে অপেক্ষমাণ প্রিয় মুখ আছে, যাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।
রাজনীতি আদর্শের হওয়ার কথা ছিল, মানুষের কল্যাণের হওয়ার কথা ছিল। অথচ বাস্তবতায় তা অনেক সময় পরিবার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই বলতে হয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি বিপন্ন সেই মানুষগুলো, যাদের ঘরে এখনো ভালোবাসা নিয়ে কেউ অপেক্ষা করে।
হাবিবুল্লাহ মিঠু
সংবাদকর্মী
স্বরূপবার্তায় প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণই লেখকের নিজস্ব, এর দায়ভার স্বরূপবার্তা বহন করে না।
