স্বরূপকাঠির সবুজ স্বর্ণ

পিরোজপুরের স্বরূপকাঠিকে অনেকেই চেনেন কাঁঠাল ও সুপারি গাছের জন্য। কিন্তু সময় বদলে দিয়েছে এই পরিচয়। এখন এই উপজেলা পরিচিত দেশের অন্যতম বৃহৎ নার্সারি অঞ্চলের নাম হিসেবে। একটি সবুজ শিল্প, যা শুধু গাছই নয়, বদলে দিচ্ছে হাজারো মানুষের জীবনচিত্র। দুই শতাব্দী আগে শুরু হওয়া এই নার্সারি কার্যক্রম আজ গ্রামীণ অর্থনীতির শক্তিশালী রোল মডেলে রূপ নিচ্ছে।

উপজেলার ৩৮টি গ্রামে বিস্তৃত ৫০০ হেক্টর জমিতে গড়ে উঠেছে দুই হাজারের বেশি নার্সারি। বছরের শুরুতে যখন অধিকাংশ গ্রামে কৃষিকাজ কিছুটা থমকে যায়, তখনই স্বরূপকাঠির নার্সারিগুলোতে বাড়তে থাকে প্রস্তুতির ব্যস্ততা। আর বর্ষা এলেই সেই ব্যস্ততা পৌঁছে যায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। এখানকার উদ্যোক্তারা উৎপাদন করেন ফলদ, ফুলের, ঔষধি ও বনজসহ নানা প্রজাতির চারা। দেশি প্রজাতির পাশাপাশি কলমচারা ও বিদেশি ফলের চারাও রয়েছে বাজার তালিকায়। জাতীয় চারা চাহিদার বড় অংশই পূরণ হয় এই ছোট্ট উপজেলার শ্রমঘন শিল্প থেকে।

অর্থনৈতিক প্রবাহও কম নয়। স্বরূপকাঠির নার্সারিগুলো থেকে প্রতি বছর প্রায় ১০০ কোটি টাকার চারা কেনাবেচা হয়। একেকটি নার্সারিতে ৫ থেকে ৭ জন শ্রমিক কাজ করেন; সব মিলিয়ে প্রায় ১০-১২ হাজার শ্রমিকের স্থায়ী কর্মসংস্থান হয়েছে। পাশাপাশি পরিবহন, সার-কীটনাশক ব্যবসা, বাঁশ-বেড়ার দোকান, পাইকারি বাজার এসবকে ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আরও প্রায় ৩০ হাজার মানুষের জীবিকা জড়িত।

বছরাকাঠি, সাউথখালী, নানদোয়হান, সারেংকাঠি সব মিলিয়ে এ নার্সারি অর্থনীতি এখন বেকারত্ব কমানোর দৃশ্যমান ভূমিকা রাখছে। অনেক পরিবারে নতুন করে আশার আলোও জ্বালিয়েছে।

স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ভাষায়, একটি মাঝারি নার্সারি থেকে মৌসুমভেদে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার চারা বিক্রি হয়। বর্ষা মৌসুমে বিক্রি সবচেয়ে বেশি, কারণ তখন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা এসে চারা সংগ্রহ করেন।

পরিবেশবিদরা বলছেন, স্বরূপকাঠির এই নার্সারি শিল্প শুধু অর্থনৈতিক সম্ভাবনাই নয়, পরিবেশ রক্ষায়ও বড় অবদান রাখছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় গাছ লাগানোর প্রবণতা বাড়ায় এখানকার নার্সারিগুলোর সবুজ ছায়া ছড়িয়ে পড়ছে আরও দূরে। পরিকল্পিতভাবে এ শিল্পের সম্প্রসারণ হলে, স্বরূপকাঠি হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম গ্রিন ইকোনমি কেন্দ্র।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *