নিজস্ব প্রতিবেদক: নেছারাবাদ উপজেলা বহু বছর ধরে নদী-খাল-বিল ও মিষ্টি পানির ওপর নির্ভরশীল একটি উর্বর কৃষিভূমি হিসেবে পরিচিত ছিল। বরিশাল অঞ্চলের এই সবুজ উপজেলা সবসময়ই কৃষি, ফলজ বাগান, জলজ সম্পদ এবং শান্তিপূর্ণ গ্রামীণ জীবনের সমন্বয়ে একটি পরিবেশগত ভারসাম্য ধরে রেখেছিল। কিন্তু গত দশকে এবং বিশেষ করে সাম্প্রতিক পাঁচ বছরে এই অঞ্চলের প্রকৃতি ও জনজীবনে বড় ধরনের বদল দেখা যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে নেছারাবাদে মাটি ও পানিতে লবণাক্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা শুধু পরিবেশের ওপর নয়, মানুষের স্বাভাবিক জীবন, কৃষি উৎপাদন, জনস্বাস্থ্য ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপর বহুমাত্রিক আঘাত হানছে। একসময় যে অঞ্চল ছিল মিষ্টি পানির নদীঘেরা, আজ সেখানে শুষ্ক মৌসুমে নোনা পানির আধিপত্য চোখে পড়ে। এই পরিবর্তন নেছারাবাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকেও নড়বড়ে করে তুলেছে।
২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর নেছারাবাদে লবণাক্ততার প্রথম বড় প্রভাব দেখা দেয়। সিডরের জলোচ্ছ্বাস নদী-খাল-বিলে লবণপানি ঢুকিয়ে দেয়, যা বহু বছর ধরে স্থায়ী ছিল। তবে তখনও লবণাক্ততা মৌসুমি ছিল এবং প্রভাব তুলনামূলক সীমিত ছিল। কিন্তু গত পাঁচ বছরে পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। স্থানীয়দের মতে, আগে ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত নদীর পানি সামান্য নোনা হতো, এখন ডিসেম্বর থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রায় সাত মাস নদী ও খালের পানি মিষ্টি থাকে না। বরিশাল বিভাগের অন্য কোনো অভ্যন্তরীণ উপজেলায় এত দীর্ঘ মৌসুমি লবণাক্ততার উদাহরণ খুব কম। নদী-খালের এই নোনাভাব এখন শুকনো মৌসুমের স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। এর পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড় আম্পান, ইয়াস, সিত্রাংয়ের মতো সাম্প্রতিক দুর্যোগগুলোও নিয়মিতভাবে লবণাক্ত পানি ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। প্রতিবারই নতুন করে লবণ জমে থাকে মাটি ও পানির স্তরে, ফলে মিষ্টি পানির গ্রামগুলো এখন লবণাক্ততার জোনে পরিণত হচ্ছে ধীরে ধীরে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে কৃষিতে। নেছারাবাদে যে জমিতে বছরজুড়ে তিন মৌসুমের ফসল হতো, এখন সেই জমির বড় একটি অংশ শুষ্ক মৌসুমে অনাবাদি পড়ে থাকে। কৃষকেরা বলছেন, নদীর পানি এখন আর সেচের কাজে ব্যবহার করা যায় না, কারণ পানিতে লবণের মাত্রা এত বেশি যে সেচ দিলে ফসল নষ্ট হয়ে যায়। ধানের শীষ ঠিকমতো পূর্ণ হয় না, গাছের রং ফ্যাকাসে হয়ে যায় আর সবজির বীজ অঙ্কুরোদগমই হয় না। অনেক কৃষক জানান, জমিতে যত সার দেওয়া হয়, লবণ জমে থাকলে কোনো কাজ হয় না। সুপারি ও নারকেল বাগানেও লবণাক্ত বাতাস ও নোনা পানির প্রভাব পড়ছে। সুপারির শুঁটি ঝরে যাচ্ছে, নারকেল ছোট হয়ে যাচ্ছে এবং ফলন কমছে। স্থানীয়ভাবে সুপারি ও নারকেল নেছারাবাদের বড় সম্পদ হলেও লবণাক্ততার এই ধারাবাহিক প্রভাবে কৃষিব্যবস্থা এখন গুরুতর সংকটে।
নদী-খাল-বিলের পানিতে লবণ বৃদ্ধির কারণে নেছারাবাদে পানির সংকটও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আগে সন্ধ্যা ও কচা নদীর পানি দিয়ে গোসল, রান্না ও দৈনন্দিন কাজ করা যেত। এখন সেই পানি শুষ্ক মৌসুমে এতটাই নোনা হয়ে পড়ে যে গোসল করলে ত্বকে জ্বালা ধরে, কাপড় শক্ত হয়ে যায় আর বাসনপত্রে দাগ পড়ে। অনেক নলকূপেও লবণাক্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে। ফলে পানীয়জল সংগ্রহ করা এখন নেছারাবাদের সাধারণ মানুষের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। রান্নার পানিতেও লবণের স্বাদ চলে আসে, ফলে খাবারের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায় এবং পুষ্টিমানও কমে যেতে পারে। পুকুর, বিল এবং খালগুলোর প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন নেছারাবাদে সুপেয় পানি সবচেয়ে দুর্লভ সম্পদে পরিণত হচ্ছে ধীরে ধীরে।

লবণাক্ততা সরাসরি প্রভাব ফেলছে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও। নোনা পানি ব্যবহারের ফলে ত্বকের রোগ বাড়ছে। শিশু ও নারীদের মধ্যে একজিমা, র্যাশ, চুলকানি, অ্যালার্জি এসব সমস্যা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া নোনা পানি পান করার ফলে পেটের পীড়া, ডায়রিয়া, আমাশয় এসব রোগও বাড়ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, অতিরিক্ত সোডিয়াম শরীরে জমে গেলে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে, যা হৃদরোগ ও কিডনি রোগের সম্ভাবনা বাড়ায়। গর্ভবতী নারীদের জন্য লবণাক্ত পানির ঝুঁকি আরো বেশি, কারণ এতে গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ ও বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
লবণাক্ততার কারণে নেছারাবাদের সামগ্রিক অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষক, জেলে, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সবাই কমবেশি এই সংকটে পড়েছেন। কৃষিজ উৎপাদন কমে গেলে বাজারে সবজির মূল্য বাড়ে, মাছ কমে গেলে খাদ্যব্যয় বাড়ে, সুপারি-নারকেলের ফলন কমলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। কর্মসংস্থানে স্থবিরতা দেখা দিলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে শহরমুখী হচ্ছে, যা সামাজিক পরিবর্তনও ডেকে আনছে। নেছারাবাদের যুবসমাজের একটি বড় অংশ এখন স্থায়ী জীবিকার সন্ধানে কাজের জন্য শহর বা দেশের বাইরে চলে যেতে হচ্ছে।
লবণাক্ততার এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি নেছারাবাদের খাদ্যনিরাপত্তাকেও সরাসরি প্রভাবিত করছে। ধানের উৎপাদন কমে যাওয়ায় স্থানীয়ভাবে চালের ওপর নির্ভরশীলতা নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে। সবজি উৎপাদন কমে গেলে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে, যা নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে দেয়। দেশি মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার পুষ্টিজনিত সমস্যায় পড়ছে। শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। খাদ্যের জন্য বাইরের জেলার ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ায় নেছারাবাদের খাদ্যব্যবস্থায় নতুন চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
ভবিষ্যতে লবণাক্ততার ঝুঁকি আরও বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে থাকলে উপকূলীয় এলাকার আরও ভেতরে লবণাক্ততা প্রবেশ করবে। ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বাড়লে প্রতিবারই জলোচ্ছ্বাসের পানি ভেতরে ঢুকে মাটি ও পানির লবণমাত্রা বাড়িয়ে দেবে। এতে নেছারাবাদে আরও জমি অনাবাদি হয়ে পড়তে পারে, পানীয়জলের সংকট দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে, মানুষের অভ্যন্তরীণ অভিবাসন বাড়তে পারে এবং জীবিকা আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। স্থানীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য বদলে যাবে এবং মিষ্টি পানির বাস্তুসংস্থান লবণাক্ততায় রূপান্তরিত হতে পারে।
পরিস্থিতি সামলাতে এখনই উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। স্থানীয় পর্যায়ে লবণসহনশীল ফসল চাষ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নদী-খাল পুনঃখনন, বিশুদ্ধ পানির প্লান্ট স্থাপন এবং বিকল্প জীবিকা সৃষ্টির মতো পদক্ষেপ গ্রহণ খুব প্রয়োজন হয়ে উঠেছে। সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা কঠিন হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধীরগতির বিপর্যয় নেছারাবাদের মানুষের দৈনন্দিন জীবন, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎকে নানাভাবে প্রভাবিত করছে। মানুষ এখন এমন এক বাস্তবতার মধ্যে বসবাস করছে, যেখানে জীবিকার পাশাপাশি পরিবেশের সঙ্গেও প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে। নেছারাবাদের বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দেয়, জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের হুমকি নয় এটি বর্তমান দিনের বাস্তব সংকট, যার সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি।
