আজ পিরোজপুর হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে লাল-সবুজের বিজয় পতাকা প্রথমবারের মতো ঘরে ঘরে উড়েছিল, শত্রুমুক্ত পিরোজপুরের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী দখলদারত্বের অবসান ঘটে ৮ ডিসেম্বর, যখন পাকহানাদার বাহিনী পিরোজপুর ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
মুক্তিযুদ্ধকালে পিরোজপুর ছিল নবম সেক্টরের অধীনে। সুন্দরবন সাবসেক্টরের কমান্ডার মেজর জিয়াউদ্দিনের নেতৃত্বে এখানকার মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।
১৯৭১ সালের ৩ মে বরিশাল থেকে গানবোটে চড়ে ৩২ পাঞ্জাব ও ২২ বালুচ রেজিমেন্টের দুই প্লাটুন সৈন্য প্রথম শহরে প্রবেশ করে। হুলারহাট নৌবন্দর অতিক্রম করে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় বর্বরতা মাছিমপুর ও কৃষ্ণনগর গ্রামে নির্বিচারে গণহত্যা। ওই দিনেই তারা শতাধিক নিরীহ নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে; আগুন ধরিয়ে দেয় শত শত বাড়িঘর, বাজার, দোকানপাট ও খাদ্যগুদাম। জেলা জুড়ে শান্তি কমিটির নেতা ও সহযোগী রাজাকারদের সহায়তায় এই তাণ্ডব চলতে থাকে টানা সাত মাস।
৫ মে বলেশ্বর নদীর তীরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় পিরোজপুরের মহাকুমা প্রশাসক মো. আবদুর রাজ্জাক, ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল বারী মিজানুর রহমান, পুলিশ অফিসার ফয়জুর রহমান আহমদসহ সরকারি কর্মকর্তাদের যা এ অঞ্চলের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞগুলোর একটি।
দখলদার বাহিনী পালিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ৩০ হাজারেরও বেশি মুক্তিকামী মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে। শহরের ছাত্রনেতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পতাকা উত্তোলনকারী ওমর ফারুক, ফজলুল হক খোকন, বিধান মন্টু, সেলিম, যশোর শিক্ষা বোর্ডে দ্বৈত মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অধিকারকারী প্রতিভাবান ছাত্র গণপতি হালদার, জিয়াউজ্জামান, গৃহবধূ ভাগীরথী সাহা এমন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে পৈশাচিকভাবে হত্যা করা হয় বলেশ্বর খেয়াঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে।
পিরোজপুরকে মুক্ত করতে ৭ ডিসেম্বর রাতে মেজর জিয়াউদ্দিনের নির্দেশে দুটি মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী শহরের দিকে অগ্রসর হয়। একটি সামছুল হক খানের নেতৃত্বে পাড়েরহাট ঘাঁটি থেকে, অন্যটি হাবিবুর রহমান সিকদারের নেতৃত্বে নাজিরপুর দিক থেকে। এই সংবাদ পেয়ে পাকবাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে। স্বরূপকাঠির পেয়ারা বাগানে মুক্তিযোদ্ধাদের দুর্গে আক্রমণ করে ব্যর্থ হয়ে কয়েকজন পাকসেনা নিহত হয়। বিভিন্ন স্থানে গেরিলা আক্রমণে আক্রান্ত হতে হতে তারা দিশেহারা হয়ে পড়ে।
শেষ পর্যন্ত ৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ দখলদার বাহিনী গানবোটে উঠে বরিশালের দিকে পালিয়ে যায়। যাওয়ার আগে তারা ন্যাশনাল ব্যাংক লুট করে সঞ্চিত টাকা ও স্বর্ণ নিয়ে যায়।
পিরোজপুরের মানুষ সেই দিন নতুন করে শ্বাস নিয়েছিল । স্বাধীনতার প্রথম আলোয়, মুক্ত আকাশে, রক্ত ও অগ্নির ভেতর দিয়ে পাওয়া বিজয়ের গৌরব নিয়ে।
