নদী, বাগান আর রক্তে লেখা স্বরূপকাঠির বিজয়ের দিন

স্বরূপবার্তা ডেস্ক: ১৮ ডিসেম্বর, এই তারিখটি শুধু ক্যালেন্ডারের একটি দিন নয়, এটি স্বরূপকাঠির মানুষের বেঁচে থাকার গল্প, ভয়কে জয় করার ইতিহাস, আর রক্তের দামে অর্জিত স্বাধীনতার চিহ্ন। ১৯৭১ সালের এই দিনেই পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি (নেছারাবাদ) উপজেলা সম্পূর্ণভাবে শত্রুমুক্ত হয়। দুই দিন দেরিতে হলেও এই জনপদের আকাশে উড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। ঘোষণা করে দেয়, অবশেষে শেষ হয়েছে দখলদারিত্বের অন্ধকার।

এই বিজয়ের পথ সহজ ছিল না। মার্চের শুরু থেকেই স্বরূপকাঠিতে জমে উঠছিল অস্থিরতা, প্রতিরোধ আর যুদ্ধের প্রস্তুতি। নদী-খাল আর ঘন পেয়ারা বাগানে ঘেরা এই অঞ্চলটি পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য ছিল যেমন বিপজ্জনক, তেমনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য হয়ে ওঠে এক আদর্শ গেরিলা যুদ্ধভূমি। স্থানীয় মানুষ, তরুণরা, কৃষক সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।

৪ মে পিরোজপুর শহরে ঢুকে পাকিস্তানি বাহিনী মাছিমপুর-কৃষ্ণনগরে গণহত্যা চালায়। এর ধারাবাহিকতায় ১১ মে তারা নদীপথে স্বরূপকাঠিতে প্রবেশ করে এবং ক্যাম্প স্থাপন করে। স্থানীয় রাজাকার ও আলবদরদের সহায়তায় বিভিন্ন শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিণত হয় সামরিক ঘাঁটিতে। সেখান থেকেই কুড়িয়ানা, বরছাকাঠি, সোহাগদলসহ আশপাশের গ্রামে শুরু হয় লুটপাট, ধরপাকড়, নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ।

এই অন্ধকার সময়েই আশার আলো হয়ে ওঠে কুড়িয়ানা পেয়ারা বাগান। ক্যাপ্টেন মাহফুজ আলম বেগ, এ এম জি কবীর ভুলু এবং স্থানীয় তরুণদের নেতৃত্বে এই বাগানটি রূপ নেয় মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম শক্তিশালী গেরিলা ঘাঁটিতে। বহুবার পাক বাহিনী হামলা চালালেও ঘন বাগান আর সুসংগঠিত প্রতিরোধ ভেদ করতে পারেনি তারা। এখান থেকেই একের পর এক হামলা চালিয়ে শত্রু বাহিনীকে দুর্বল করে দেওয়া হয়।

স্বরূপকাঠির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক গর্বের অধ্যায় নারী মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব। বীথিকা বিশ্বাস, শিশিরকণা মল্লিক ও কনক প্রভা শুধু সহায়কের ভূমিকায় ছিলেন না তাঁরা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন। ১১ জুলাই ১৯৭১ সালের এক বৃষ্টিভেজা রাতে বীথিকা বিশ্বাস ও শিশিরকণা মল্লিক পানিতে নেমে পাকিস্তানি বাহিনীর গানবোটে গ্রেনেড হামলা চালান। দক্ষিণাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধে এই অভিযান আজও সাহস ও দৃঢ়তার প্রতীক হয়ে আছে।

অন্যদিকে, স্বরূপকাঠির মাটিতে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য বধ্যভূমির নীরব আর্তনাদ। কুড়িয়ানা আর্য সম্মিলনী স্কুলের পেছনে, বরছাকাঠি, সোহাগদল, শেখপাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে মানুষ ধরে এনে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। শিশু, নারী, বৃদ্ধ কারও জন্যই ছিল না রেহাই। দুঃখজনকভাবে, এসব বধ্যভূমির অনেকগুলো আজও অচিহ্নিত ও অরক্ষিত।

১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর এলেও স্বরূপকাঠিতে তখনো রয়ে যায় শত্রুদের উপস্থিতি। অবশেষে মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত অভিযানে ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ স্বরূপকাঠি সম্পূর্ণভাবে শত্রুমুক্ত হয়। সেই দিনই প্রথমবারের মতো এই জনপদের মানুষ স্বাধীনতার স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়।

আজ বিজয়ের এই দিনে স্বরূপকাঠি শুধু আনন্দ করে না, সে স্মরণ করে। স্মরণ করে শহীদদের রক্ত, নারীদের সাহস, পেয়ারা বাগানের প্রতিরোধ আর সাধারণ মানুষের অবর্ণনীয় ত্যাগ। এই ইতিহাস কেবল অতীত নয়, এটি আমাদের পরিচয়, আমাদের দায়িত্ব, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক জীবন্ত পাঠ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *