উপজেলা বদলালেও অভিযোগ ও বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না ইউএনও’র

স্বরূপবার্তা ডেস্ক: উপজেলার বর্তমান ইউএনও মো. জাহিদুল ইসলামকে ঘিরে একাধিক উপজেলায় দায়িত্ব পালনের সময় নানা ধরনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ শুধু স্থানীয় প্রশাসন নয়, সংশ্লিষ্ট এলাকার সাধারণ মানুষকেও দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। পাবনার সাঁথিয়া ও বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলায় তাঁর বিরুদ্ধে যে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, অনুমোদনহীন সিদ্ধান্ত ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছিল, তা এখন নেছারাবাদের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সঙ্গে মিলে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

পাবনার সাঁথিয়ায় দায়িত্বে থাকাকালে সরকারি অনুমোদন ছাড়াই প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার নামে বই বিতরণ এবং প্রতিটি বিদ্যালয় থেকে তিন হাজার টাকা করে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ইউএনও নিজ উদ্যোগে ঢাকা থেকে বই কিনে নিজের অফিসে মজুদ রাখতেন, পরে শিক্ষা কর্মকর্তা ও কেরানিদের মাধ্যমে সেগুলো বেশি দামে বিক্রি করতেন। শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, বই নিতে আপত্তি জানালে শিক্ষা অফিসের হঠাৎ ভিজিট, দেরিতে আসাসহ ছোটখাটো অজুহাতে শোকজ দেওয়া হতো। অনেক শিক্ষক মনে করেন, বই না নিলে চাকরিতে সমস্যার আশঙ্কা ছিল। ওই সময় জেলা প্রশাসকও বলেন, সরকারি নির্দেশ ছাড়া এভাবে বই বিতরণ বা টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হলেও কোনো ফলাফল সামনে আনা হয়নি, যা অনেকের কাছে তদন্তটি চাপা পড়েছে বলেই মনে হয়।

এরপর বাগেরহাটের শরণখোলায় আরও গুরুতর অভিযোগ ওঠে জাহিদুল ইস্লামের বিরুদ্ধে। হাট-বাজার রক্ষণাবেক্ষণ খাতের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের চারটি প্রকল্পের জন্য মোট ২৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়। অভিযোগ হলো, এই প্রকল্পগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশের কাজ মাঠে হয়নি, কিন্তু ইউএনওর স্বাক্ষরে একাই রেজুলেশন করে প্রায় ১০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। স্থানীয় চেয়ারম্যান, প্রকৌশলী এবং বাজার কমিটির সদস্যরা জানান, তাদের কোনো অনুমোদন, স্বাক্ষর বা পরামর্শ ছাড়াই কাগজপত্রে প্রকল্প অনুমোদন দেখানো হয়। একাধিক চেয়ারম্যান জানান, তারা বিষয়টি জানতে পারার পর প্রকল্প পরিবর্তনের দ্বিতীয় রেজুলেশন তৈরি করা হয়। প্রকল্পে ব্যবহৃত হওয়ার কথা থাকা অর্থের বিপরীতে মাটিতে বাস্তব কাজ নেই এমন প্রমাণ স্থানীয় সাংবাদিক ও বাসিন্দারা দেখান তখন।

সংবাদ গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে তদন্ত শুরু হয়, তবে তদন্তটি অত্যন্ত গোপনে সম্পন্ন হয়। তদন্ত কর্মকর্তা বাগেরহাটে এলেও প্রকল্প এলাকার মানুষ, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান কিংবা ঠিকাদার কাউকেই জানানো হয়নি। তদন্তকাজ চলাকালে সাংবাদিকদের বিষয়টি জানতেও বাধা দেওয়া হয়। অভিযোগের পর ইউএনও চাপের মুখে আত্মসাৎ হওয়া টাকা ফেরত পাঠান বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। পরে হঠাৎ তড়িঘড়ি করে টলশেড মেরামত ও ড্রেন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। স্থানীয়রা বলেন, প্রকল্পের টাকা ফেরত দিয়ে কাজ শুরু করা হয়েছে মূলত তদন্তের প্রেক্ষিতে আগের অনিয়ম ঢাকার জন্য।

এই সব ঘটনার পর নেছারাবাদে দায়িত্ব নিয়ে আবারও একাধিক বিতর্কে জড়ান ইউএনও। সম্প্রতি উপজেলা পরিষদ হলরুমে ১৬৯ জন প্রধান শিক্ষকের হাতে তাঁর লেখা ‘পথহীন প্রান্তরে’ নামের কবিতার বই বিতরণ করা হয় এবং প্রতিটি বইয়ের জন্য ১৫০ টাকা করে নেওয়া হয়। শিক্ষকরা জানান, বই না কিনলে চাকরিতে সমস্যার আশঙ্কা থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে কিনেছেন। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, ইউএনওর নির্দেশেই বই হস্তান্তর ও টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। যদিও ইউএনও পরে দাবি করেন, বই চাপিয়ে দেওয়া বা বিক্রির বিষয়টি তাঁর জানা নেই।

নেছারাবাদে তার বিরুদ্ধে আরেকটি নতুন অভিযোগ হলো সরকারি খেলার মাঠ দখল করে অনুমোদন ছাড়াই একটি বিদ্যালয় নির্মাণ। মাঠের একাংশে ইটের দেয়াল তুলে ‘নেছারাবাদ আইডিয়াল ইনস্টিটিউট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে, যার উদ্যোক্তা ও সভাপতি স্বয়ং ইউএনও। স্থানীয়দের দাবি, মাঠটি বহু বছর ধরে খেলাধুলা ও সামাজিক অনুষ্ঠানের কেন্দ্র ছিল। সেখানে নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় মাঠের ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া ১৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরির প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, ইটভাটা ও ক্লিনিকগুলো থেকে সহযোগিতার নামে ইট ও টাকা আদায় করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সহযোগিতা না দিলে প্রশাসনিক ঝামেলায় পড়ার আশঙ্কা ছিল। ইউএনও অবশ্য বলেছেন, এটি সুশিক্ষার মানোন্নয়নের উদ্যোগ এবং সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহায়তা করেছেন।

এই ধারাবাহিক অভিযোগগুলোকে আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। তিন জায়গার ঘটনাই একই ধরনের আচরণগত প্যাটার্নকে নির্দেশ করে , অনুমোদন ছাড়াই উদ্যোগ নেওয়া, প্রভাব খাটানো, আর্থিক লেনদেনকে কর্তৃত্বের অংশ হিসেবে দেখা, আপত্তি এলে শোকজ বা প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ করা এবং অভিযোগ উঠলে দায় অস্বীকার বা তদন্ত গোপন রাখা। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুনরাবৃত্ত এ ধরনের আচরণ একজন কর্মকর্তার ক্ষমতা কেন্দ্রিক মনস্তত্ত্বের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে নিয়ম-কানুনের চেয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এবং জবাবদিহির বদলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়।

নেছারাবাদের মানুষের উদ্বেগ তাই স্বাভাবিক। স্থানীয়দের প্রশ্ন, একাধিক এলাকায় একই ধরনের অভিযোগ উঠলেও একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কেন নেওয়া হয়নি? আর এই অজবাবদিহির পরিবেশ কি একই ধরনের আচরণকে উৎসাহিত করছে না? সব মিলিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে ইউএনও জাহিদুল ইসলামের কর্মকাণ্ড।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *