এআই যুগে সাংবাদিকতা: অবলুপ্তি নাকি নতুন জাগরণ?

বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) এক তীব্র ঝোড়ো হাওয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সকালের চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে যে পত্রিকাটি আমরা পড়ি বা স্ক্রিনে যে নিউজ পোর্টালটি স্ক্রোল করি, তার নেপথ্যে এখন কেবল রক্ত-মাংসের সাংবাদিকের আঙুল নয়, খেলা করছে চতুর কিছু অ্যালগরিদমও।

নিউজরুমগুলোতে এখন নিঃশব্দে জায়গা করে নিয়েছে চ্যাটজিপিটি, মিডজার্নি কিংবা স্বয়ংক্রিয় রিপোর্টিং সফটওয়্যার। তারা খবর লিখছে, ছবি আঁকছে, এমনকি নিমেষেই ভিডিও সম্পাদনা করে ফেলছে। এই যে চটজলদি খবরের জোগান, তা দেখে অনেকের মনেই সংশয় জাগছে তবে কি এআই যুগে মানুষ সাংবাদিকতার জায়গা হারাবে? নাকি এই প্রযুক্তি মানুষকে নতুন কোনো দিগন্তে জাগিয়ে তুলবে?

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রযুক্তি কখনোই মানুষকে পুরোপুরি মুছে দেয় না, বরং তাকে নতুনভাবে খাপ খাইয়ে নিতে বাধ্য করে। একসময় সাংবাদিকতা মানে ছিল টাইপরাইটারের খটখট শব্দ, মাঠে গিয়ে ডায়েরিতে তথ্য টুকে নেওয়া, আর হাতে কেটেকুটে সম্পাদনা করা। সেখান থেকে কম্পিউটার, ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আগমন যখন ঘটেছিল, তখনও অনেকের চাকরি হারানোর ভয় ছিল। কিন্তু মানুষ হারিয়ে যায়নি; বরং আরও শক্তিশালীভাবে ডানা মেলেছে। এআই-এর আগমনও সেই বিবর্তনেরই একটি নতুন এবং অতি-উন্নত ধাপ মাত্র।

কেন রোবট কখনো ‘সাংবাদিক’ হতে পারবে না?
একটি ফুটবল ম্যাচ শেষ হওয়ার ঠিক তিন মিনিটের মাথায় এআই হয়তো নিখুঁত পরিসংখ্যান দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট নামিয়ে দিতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকতা কি কেবলই কিছু তথ্যের শুষ্ক কোলাজ? মোটেও না। সাংবাদিকতা হলো সমাজের বিবেক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক জীবন্ত কণ্ঠস্বর।
কোনো একটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর সেখানে ছড়িয়ে থাকা মানুষের কান্না, স্বজন হারানোর বেদনা কিংবা বেঁচে থাকার আকুতি কোনো অ্যালগরিদম অনুভব করতে পারে না। এআই ডেটা প্রসেস করতে পারে, কিন্তু মানুষের চোখের ভাষা পড়তে পারে না। অন্যায় দেখে রক্ত গরম হওয়া কিংবা শোষিতের পক্ষে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর যে মানবিক দায়বদ্ধতা ও নৈতিকতা তা কোনো কোডিং দিয়ে তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই সাংবাদিকতার যে ‘আত্মা’, তা চিরকাল মানুষের বুকেই স্পন্দিত হবে, মেশিনের প্রসেসরে নয়। এআই যখন সহায়ক, মানুষের ভূমিকা তখন বিশ্লেষকের এই নতুন যুগে প্রযুক্তিকে ভয় পেয়ে মুখ লুকিয়ে রাখার কোনো উপায় নেই। বরং একে আলিঙ্গন করে নিজের শক্তি বাড়াতে হবে। আজকের সাংবাদিককে কেবল একজন ‘তথ্য সরবরাহকারী’ হলে চলবে না, তাকে হতে হবে গভীর বিশ্লেষক।

ভবিষ্যতের সাংবাদিকতা হবে প্রযুক্তি-দক্ষ মানুষের হাতে। যিনি একাধারে ডেটা অ্যানালাইসিস বুঝবেন, আবার সঠিক সময়ে নিজের মানবিক বিচারবোধ খাটানোতেও দক্ষ হবেন। দিনশেষে এআই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে না, মানুষই এআই-কে নিজের কলমের ধার বাড়াতে ব্যবহার করবে।

ভুয়া খবরের মহোৎসব ও সত্যের নতুন যুদ্ধ
বর্তমান সময়ে এআই-এর সবচেয়ে বড় অন্ধকার দিক হলো এর অপব্যবহার। ডিপফেইক ভিডিও, নিখুঁতভাবে তৈরি করা ভুয়া ছবি আর কৃত্রিমভাবে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর প্রোপাগান্ডা এখন জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তথ্য যখন অতি-সহজলভ্য এবং একই সাথে অতি-ভেজাল, ঠিক তখনই পেশাদার সাংবাদিকদের দায়িত্ব আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে যায়।

এখনকার যুদ্ধটা শুধু দ্রুত খবর দেওয়ার নয়, এখনকার বড় যুদ্ধটা হলো ‘সত্য রক্ষার’। কোটি কোটি ফেক নিউজের ভিড়ে কোনটা আসল আর কোনটা নকল, তা ফিল্টার করে মানুষের সামনে আনার গুরুদায়িত্ব এখন সাংবাদিকের। মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতার যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে একজন সৎ ও সাহসী সাংবাদিকের কোনো বিকল্প নেই।

এআই হয়তো সাংবাদিকতার যান্ত্রিক কাজগুলোকে সহজ করে দিয়েছে, কিন্তু এর সৃজনশীলতায় হাত দেওয়ার সাধ্য তার নেই। সত্যের নিবিড় অনুসন্ধান, ন্যায়ের পক্ষে অবিচল অবস্থান এবং মানুষের ভেতরের মানবিক গল্পগুলোকে তুলে ধরা এই তিন শক্তির ওপর ভর করেই সাংবাদিকতা টিকে থাকবে।
মেশিন যতই নিখুঁত হোক, সে রোবটই রয়ে যাবে। আর মানুষ তার ভুল, ত্রুটি, আবেগ এবং অদম্য সাহস নিয়ে বরাবরের মতোই নিউজরুমের আসল চালিকাশক্তি হয়ে থাকবে। এআই যুগে সাংবাদিকতা হারাবে না; বরং জঞ্জালমুক্ত হয়ে আরও বেশি ধারালো, বিশ্লেষণধর্মী এবং মানবিক হয়ে নতুনভাবে জেগে উঠবে।

দেবাশীষ মন্ডল আশীষ
গণমাধ্যম কর্মী
তারিখ: ১৩.০৬.২৬ ইং

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *