এলপিজি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি: সাধারণ মানুষের নীরব চাপা আর্তনাদ

দেশের জ্বালানি খাতে আবারও অস্থিরতার বার্তা দিল ভোক্তাপর্যায়ের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) মূল্যবৃদ্ধি। এপ্রিল মাসের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে ১,৭২৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে (বিইআরসি), যা কার্যকর হয়েছে ঘোষণার দিন সন্ধ্যা থেকেই। একই সঙ্গে অটোগ্যাসের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে এই মূল্যবৃদ্ধির বোঝা কে বহন করবে? এর সরল উত্তর: দেশের সাধারণ মানুষ।

বাংলাদেশের অধিকাংশ শহর ও শহরতলির মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার রান্নার জন্য এখন এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক গ্যাস সংযোগ সীমিত হওয়ায় বিকল্প হিসেবে এলপিজিই তাদের প্রধান ভরসা। কিন্তু যখন একটি সিলিন্ডারের দাম এক মাসেই প্রায় ৪০০ টাকা বেড়ে যায়, তখন তা সরাসরি পরিবারের মাসিক বাজেটে চাপ সৃষ্টি করে।

বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি যেন একপ্রকার ‘নীরব সংকট’। তারা হয়তো রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে পারেন না, কিন্তু তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় এর প্রভাব গভীর। রান্নার খরচ কমাতে গিয়ে অনেক পরিবার হয়তো খাবারের মান কমাতে বাধ্য হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে, অটোগ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়বে পরিবহন খাতে। গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। ফলে এক ধরনের ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ তৈরি হবে, যেখানে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পুরো অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেবে।
বিইআরসি সাধারণত আন্তর্জাতিক বাজারদর, আমদানি খরচ এবং ডলারের বিনিময় হার বিবেচনা করে দাম নির্ধারণ করে থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই হিসাবের মধ্যে কি সাধারণ মানুষের সহনশীলতা বা ক্রয়ক্ষমতা যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে?

বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি, যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা যেমন বিবেচনায় থাকবে, তেমনি দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানও সুরক্ষিত থাকবে। প্রয়োজনে সরকার ভর্তুকি বা বিকল্প সহায়তা ব্যবস্থার কথা ভাবতে পারে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য।

এলপিজির এই রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি কেবল একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়—এটি একটি সামাজিক বাস্তবতা, যা প্রতিদিনের জীবনে প্রভাব ফেলবে লাখো মানুষের। তাই নীতিনির্ধারকদের উচিত শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, মানুষের কষ্টের হিসাবটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা।

দেবাশীষ মন্ডল আশীষ
(গণমাধ্যমকর্মী)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *