স্কুল ফিডিং-উদ্যোগের মহৎ লক্ষ্য, বাস্তবতায় কেন এত গরমিল?

পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য চালু হওয়া স্কুল ফিডিং কর্মসূচি নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। শিশুপুষ্টি নিশ্চিত করা, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানো এবং ঝরে পড়া রোধ এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য সামনে রেখে এমন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই ভালো উদ্যোগটি শুরুতেই নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।

প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত মানের ৬০ গ্রাম ডিমের পরিবর্তে ৪০-৪২ গ্রাম ওজনের ছোট ডিম বিতরণ এবং পরদিন দুধের পরিবর্তে নিম্নমানের কলা সরবরাহ এসব ঘটনা শুধু নিয়ম লঙ্ঘনই নয়, বরং দায়িত্বহীনতারও পরিচায়ক। শিশুদের পুষ্টির বিষয়টি যেখানে অত্যন্ত সংবেদনশীল, সেখানে এ ধরনের অবহেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

স্কুল ফিডিং কর্মসূচির জন্য নির্ধারিত খাদ্যতালিকা শুধু একটি আনুষ্ঠানিক তালিকা নয়; এটি শিশুদের দৈনন্দিন পুষ্টির চাহিদা বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে নির্ধারিত একটি বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা। ফলে এই তালিকা অনুসরণ না করা মানে শিশুদের পুষ্টি থেকে বঞ্চিত করা। দুধের পরিবর্তে কলা দেওয়া বা নির্ধারিত দিনের খাবার অন্যদিন সরবরাহ করা এসব অনিয়ম শুধু পরিকল্পনার ব্যত্যয় নয়, বরং পুরো কর্মসূচির উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বাস্তবায়নকারী সংস্থার পক্ষ থেকে ‘প্রথম দিকে কিছু সমস্যা হতে পারে’ এমন বক্তব্য আংশিকভাবে গ্রহণযোগ্য হলেও তা দিয়ে দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। কারণ, এত বড় একটি কর্মসূচি হাতে নেওয়ার আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। বিশেষ করে খাদ্যের মান বজায় রাখা এবং সঠিক সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা এই দুইটি বিষয় কোনোভাবেই অবহেলা করার সুযোগ নেই।

অন্যদিকে, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্যেও কিছুটা অস্পষ্টতা লক্ষ্য করা যায়। দুধ সরবরাহে সমস্যা থাকলে বিকল্প কী হবে, তা পূর্ব থেকেই নির্ধারণ করা উচিত ছিল। তা না হলে মাঠপর্যায়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

এই পরিস্থিতিতে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথমত, সরবরাহকৃত খাদ্যের মান ও পরিমাণ কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নির্ধারিত সিডিউল অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিভাবকদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। এবং সর্বোপরি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

একটি ভালো উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করে তার সঠিক বাস্তবায়নের ওপর। নেছারাবাদের স্কুল ফিডিং কর্মসূচি যদি শুরুতেই অনিয়মে জর্জরিত হয়, তবে তা শিশুদের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। তাই এখনই সময় কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার না হলে এই মহৎ উদ্যোগটি তার উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলবে।

দেবাশীষ মন্ডল আশীষ
(গণমাধ্যম কর্মী)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *