বই উৎসবের মাঠে শাসন! আমরা কি সঠিক পথে হাটছি?

ফেসবুকে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও মনোযোগ দিয়ে দেখলাম। একটি এলাকার বই উৎসব অনুষ্ঠানে একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে কঠোর ভাষায় বক্তব্য দিচ্ছেন। বক্তব্যটি শুনে প্রথমে আমার মনে হয়েছিল, তিনি হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের শাসাচ্ছেন। কিন্তু ভিডিওটি ভালো করে দেখার পর বুঝলাম। না, তিনি কথা বলছেন একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য। যাদের বয়স ১২-১৫ এর মধ্য।

তিনি বলছেন, শিক্ষার্থীদের আদর্শ ছাত্রছাত্রীসুলভ আচরণ করতে হবে, নচেৎ আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই বক্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রশ্ন মাথায় আসে।

সদ্য পঞ্চম শ্রেণি পেরিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠা একটি শিশু ‘আইনানুগ ব্যবস্থা’ বলতে কী বোঝে? এমনকি সপ্তম, অষ্টম কিংবা নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীরাই বা এই শব্দের প্রকৃত অর্থ কতটা অনুধাবন করতে পারে? তাদের কাছে ‘আইন’, ‘কঠোর ব্যবস্থা’ কিংবা ‘শাস্তিমূলক পদক্ষেপ’ এসব কি দায়িত্ববোধের ভাষা, নাকি নিছক ভয়? শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত রূপ ফিরিয়ে আনতে ভয় কিংবা প্রয়োজনে বেত্রাঘাত। সেটাও হতে হবে স্থান কাল পরিবেশ বেধে। ওইদিন ওখানে ওই পরিবেশ ছিলনা বলে মনে করি। ধরে নিলাম, তিনি শিক্ষার পরিবেশ সঠিকভাবে করার জন্য রুড় ভাষায় কথা বলেছেন৷ শিক্ষার সঠিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে তিনি একটি অভিভাবক সমাবেশ ডাকতে পারতেন। প্রয়োজনে শিক্ষক,অভিভাবকদের নিয়ে একটি মতবিনিময় সভা করতে পারেন প্রতি মাসে না পারুক তিন মাস পর পর একটি সভা।

শিশু-কিশোর বয়সে মানুষ সবচেয়ে বেশি শেখে পরিবেশ থেকে, ভাষা থেকে, আচরণ থেকে। এই বয়সে বলা কথাগুলো তাদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে। একটি বই উৎসব, যার মূল উদ্দেশ্য হওয়ার কথা আনন্দ, উৎসাহ, শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা তৈরি। সেই মঞ্চে যদি শাসনের ভাষা হয় ভয়নির্ভর, তাহলে সেই উৎসবের আত্মাটাই কি প্রশ্নের মুখে পড়ে না?

আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে ভাবায়। শোনা যাচ্ছে, ওই ইউএনও মহোদয় সদ্য দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন সেই এলাকায়। ওই দিনই নাকি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়। প্রথম পরিচয়ে যদি একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার ভাষা হয় কঠোরতা ও শাস্তির ইঙ্গিত, তাহলে শিক্ষার্থীদের মনে প্রশাসন সম্পর্কে কী ধারণা তৈরি হয়? তারা কি তাঁকে অভিভাবক হিসেবে দেখবে, নাকি ভয়ংকর কর্তৃত্বের প্রতীক হিসেবে?

স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন, এই লেখা শাসনের বিরোধিতা নয়। বর্তমান সময়ে কিছু শিক্ষার্থীর মধ্যে যে উগ্রতা, শৃঙ্খলাহীনতা বা সীমালঙ্ঘনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, সেটিকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শাসন প্রয়োজন, নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন, নিয়মের প্রয়োগও প্রয়োজন।

কিন্তু প্রশ্নটা হলো, শাসন হবে কীভাবে?শিশুদের ক্ষেত্রে শাসন হওয়া উচিত বোঝানোর মাধ্যমে, দায়িত্ববোধ জাগানোর ভাষায়, উদাহরণ ও অনুপ্রেরণার সাহায্যে। প্রয়োজনে বেত্রাঘাত তাও হতে হবে বয়সবেধে। ভয় দেখিয়ে সাময়িক নীরবতা তৈরি করা যায়, কিন্তু সেখান থেকে আদর্শ মানুষ তৈরি হয় না।

বই উৎসবের মাঠে দাঁড়িয়ে যদি একজন শিক্ষার্থী প্রথমবার প্রশাসনের মুখোমুখি হয়ে ‘আইনানুগ ব্যবস্থা’ শব্দটি শোনে, তাহলে সে বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট হবে, না ভীত হবে, সেই প্রশ্নটিই আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এই লেখা কোনো ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে নয়। এটি একটি বৃহত্তর প্রশ্ন, আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কী ভাষায় গড়ে তুলতে চাই? ভয় দিয়ে, না বিশ্বাস দিয়ে? শাস্তির আশঙ্কা দিয়ে, না দায়িত্ববোধের চেতনা দিয়ে?

হাবিবুল্লাহ মিঠু
সংবাদকর্মী

স্বরূপবার্তায় প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণই লেখকের নিজস্ব, এর দায়ভার স্বরূপবার্তা বহন করে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *