আইনের শাসনে বিশ্বাসী একজন নাগরিক হিসেবে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, মব জাস্টিস বা জনতার হাতে বিচার কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বিচার করার দায়িত্ব আদালত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। তা কখনো জনতার হতে পারেনা। তবে, বাস্তব জীবনের হঠাৎ সৃষ্ট সংকট ও আত্মরক্ষার প্রশ্নটি বিষয়টিকে কিছুটা জটিল করে তোলে। যা কোনভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। না আমি মবকে উসকে দিচ্ছিনা।
ঘটনাটা কিছু সময় পূর্বের। যখন লেখাটা লিখছি তখন ঘড়ির কাটা রাত ১২.৩৩ মিনিট। মানে, ২৪ ডিসেম্বর, বুধবার মধ্যরাত। ঘটনাটা মুলত ২৩ ডিসেম্বর রাত নয়টার দিকের নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের একটি প্রত্যন্ত এলাকার। সেখানে একটি ঘটনায় অভিযোগ উঠেছে, এক যুবক দেশীয় অস্ত্রসহ প্রকাশ্যে এক ব্যবসায়ীর ওপর হামলার জন্য তেড়ে আসে। মুহূর্তটির ভয়াবহতা সহজেই বোধগম্য হবে সবার। সেখানে তখন কোনো পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিল না। এমন অবস্থায় আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন রক্ষা এবং আরও বড় দুর্ঘটনা এড়াতে তিনি ডাকচিৎকার দিলে এগিয়ে আসেন স্থানীয়রা। তখন, স্থানীয়দের তাৎক্ষণিকভাবে এগিয়ে আসা ছিল স্বাভাবিক মানবিক প্রতিক্রিয়া। অস্ত্রধারী একজন হামলাকারীকে ধরে ফেলা ও তাকে নিষ্ক্রিয় করা মব জাস্টিস নয়, বরং তাৎক্ষণিক আত্মরক্ষামূলক প্রতিরোধ বলে আমি মনে করি। যদিও নেছারাবাদ থানার মান্যবর ওসি সাহেব বলেছেন, এটা নাকি মব!
তবে এখানে প্রচলিত আইনের একটি স্পষ্ট সীমারেখা রয়েছে। কাউকে ধরে শাস্তি দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে মারধর করা আইনবিরোধী। কিন্তু জীবন বাঁচাতে গিয়ে সীমিত প্রতিরোধমূলক আঘাত এবং পরিকল্পিত বা প্রতিশোধমূলক জনতা-হিংসার মধ্যে পার্থক্য আছে। এই পার্থক্যটি বুঝতে না পারলে ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এটা আমার মতামত। হতে পারে মতামত ভুল ধারনা। কারন আমিতো আর আইন বিশারদ নয়।
এই ঘটনার আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। ওই এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, স্থানীয়রা প্রথমে থানায় যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিক সাড়া পায়নি। পরে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে চৌকিদারের মাধ্যমে থানায় পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে ওসি সাহেব বলেছেন, ওই যুবককে ধরে মারধর করেছিল। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, পুরো ঘটনাপ্রবাহ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই এগিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে চৌকিদার কিংবা স্থানীয়দের একতরফাভাবে দায়ী করা হলে ভবিষ্যতে মানুষ বিপদের মুহূর্তে সহযোগিতা করতে অনীহা বোধ করবে। যা সমাজ ও নিরাপত্তার জন্য শুভ লক্ষণ নয়। চৌকাদারকে নাকি ওসি সাহেব বেজায় গালমন্দ করেছেন। গালমন্দ খাওয়ার পর চৌকিদার যাদের কাছে বলেছেন, এটা তাদেরই ভাষ্য।
আমার কথা হল, আইনের প্রয়োগ অবশ্যই হতে হবে নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত। কেন ওই যুবককে ধরা হয়েছে, কী পরিস্থিতিতে তাকে আটক করা হয়েছে, মারধর প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম করেছে কিনা, এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই বেরিয়ে আসবে।
তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে সে যেই হোক, তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে যারা জীবন রক্ষার প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে প্রতিরোধ করেছে, তাদের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আনা জরুরি।
আইনের প্রতি শ্রদ্ধা মানে অন্ধ কঠোরতা নয়। বরং ন্যায়, মানবিকতা ও বাস্তবতার আলোকে আইন প্রয়োগই প্রকৃত আইনের শাসন। সেই প্রত্যাশাই একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার।
হাবিবুল্লাহ মিঠু
সংবাদকর্মী
স্বরূপবার্তায় প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণই লেখকের নিজস্ব, এর দায়ভার স্বরূপবার্তা বহন করে না।
