পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি দক্ষিণাঞ্চলের এক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধভূমি। ঘন পেয়ারা বাগান, নদী-খাল আর দূরবর্তী গ্রামের কারণে এই এলাকা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য যেমন চ্যালেঞ্জিং ছিল, তেমনি মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা যুদ্ধের জন্য আদর্শ স্থানও হয়ে ওঠে। মার্চ থেকেই এ অঞ্চলে রাজনৈতিক উত্তেজনা, প্রতিরোধ গড়ে ওঠা এবং যুদ্ধে প্রস্তুতি শুরু হয়।
৪ মে পিরোজপুরে ঢুকে পাক বাহিনী মাছিমপুর-কৃষ্ণনগরে গণহত্যা চালায়, পরে ১১ মে স্বরূপকাঠিতে ক্যাম্প স্থাপন করে। রাজাকার-আলবদরদের সহায়তায় তারা সামরিক ঘাঁটিতে রূপান্তর করে কিছু প্রতিষ্ঠানকে। এখান থেকে আশপাশের এলাকায় ধরপাকড়, লুটপাট, হত্যা ও নারী নির্যাতন পরিচালিত হতো। কুড়িয়ানা, বরছাকাঠি, সোহাগদল অনেক গ্রামই বারবার রক্তাক্ত হয়।
এই দুঃসময়ের মাঝেই কুড়িয়ানা পেয়ারা বাগান ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটি। ক্যাপ্টেন মাহফুজ আলম বেগ, এ এম জি কবীর ভুলু এবং স্থানীয় যুবকদের নেতৃত্বে বাগানটি গেরিলা যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। পাক সেনারা বহুবার হামলা চালালেও এই ঘাঁটি দখল করতে ব্যর্থ হয়। কাছাকাছি গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের ছোট-বড় আক্রমণ পাক বাহিনীকে দুর্বল করে দেয়।
স্বরূপকাঠির মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ গর্ব নারী যোদ্ধাদের বীরত্ব। বীথিকা বিশ্বাস, শিশিরকণা মল্লিক ও কনক প্রভা শুধু তথ্য সংগ্রহ বা রসদ জোগানই দেননি। তাঁরা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন। ১১ জুলাই ১৯৭১ সালে বৃষ্টিভেজা রাতে বীথিকা ও শিশিরকণা পানিতে নেমে পাক সেনাদের গানবোটে গ্রেনেড হামলা চালান। এই অপারেশন দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে সাহসী নৌ-অভিযানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।
এদিকে স্বরূপকাঠির সবচেয়ে ভয়াবহ স্মৃতি বধ্যভূমির ইতিহাস। ২৬ মে থেকে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনী এই অঞ্চলে একের পর এক গণহত্যা চালায়। কুড়িয়ানা আর্য সম্মিলনী স্কুলের পেছনে, বরছাকাঠি, সোহাগদল ও শেখ পাড়ায় অসংখ্য মানুষকে ধরে এনে নির্যাতন শেষে গুলি করে হত্যা করা হয়। শিশু, নারী, বৃদ্ধ কেউই রেহাই পায়নি। আজও এ বধ্যভূমিগুলোর বেশিরভাগই অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। সরকারি তালিকায় মাত্র চারটি স্থানের নাম থাকলেও বাস্তবে আরও বহু কবর, গণহত্যার স্থান ও লাশ ফেলার জায়গা চিহ্নিতহীন অবস্থায় হারিয়ে যাচ্ছে।
১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় আত্মসমর্পণের পরও স্বরূপকাঠি মুক্ত হয়নি। পাক বাহিনী ও রাজাকারদের অবস্থান এখানে ছিল আরও দু’দিন। অবশেষে মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত অভিযানে ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ স্বরূপকাঠি পুরোপুরি শত্রুমুক্ত হয়। সেদিন প্রথমবারের মতো এই অঞ্চলের আকাশে উড়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা।
আজ বিজয়ের মাসের শুরুতে, স্বরূপকাঠি স্মরণ করছে সেই রক্তাক্ত ইতিহাস, বধ্যভূমির কান্না, পেয়ারা বাগানের গর্জন আর বীর শহীদদের ত্যাগ। স্বাধীনতার এই দীর্ঘ পথচলার প্রতিটি পদক্ষেপেই আছে স্বরূপকাঠির মানুষের রক্ত-ঘাম-অশ্রু। এই ইতিহাসই আমাদের গর্ব, আমাদের শক্তি, আমাদের চিরন্তন পরিচয়।
