পেয়ারা মৌসুমে উৎসবের আমেজ

স্বরূপকাঠি-এক সময় শুধু সুন্দরী কাঠ আর সুপারি,আমড়া-কাঁঠালের জন্য পরিচিত ছিল । এখন পরিচয়ের পরিধি আরও বড়। জেলার বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও শিল্পসমৃদ্ধ এই উপজেলা আজ দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ পেয়ারা উৎপাদন অঞ্চলের নামেও সমানভাবে পরিচিত। আর এই পরিচয় বুকে ধারণ করে আছে আটঘর-কুড়িয়ানা ইউনিয়ন যা স্বরূপকাঠির অর্থনীতি, কৃষি, সংস্কৃতি ও পর্যটনের উজ্জ্বলতম ঠিকানা।

শত বছরের বেশি সময় ধরে চাষ হওয়া স্থানীয় ‘স্বরূপ’ বা ‘স্বরূপকাঠি’ জাতের পেয়ারা এখনো দেশের হাতে গোনা কয়েকটি সেরা স্বাদযুক্ত ফলের মধ্যে অন্যতম। রং, স্বাদ আর পুষ্টিগুণে এই জাতের পেয়ারা দীর্ঘদিন ধরেই ‘বাংলার আপেল’ হিসেবে খ্যাত। দাম তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় এই ফলের স্বাদ নিতে পারেন সাধারণ শ্রমজীবী থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত সকল শ্রেণির মানুষ।

মৌসুমের ভরা দিনে আটঘর-কুড়িয়ানা ইউনিয়নের জলে জেগে ওঠে ১০-১২টি ভাসমান পেয়ারা হাট। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় করে কৃষকরা তুলে আনেন পাকা পেয়ারা। কে বুঝতে পারবে এগুলো একটি হাট, বরং মনে হয় যেন জল-উৎসবের আয়োজন। নৌকা ভরতি পেয়ারা, ডাক–চলাচল আর দরদামের শব্দ সব মিলিয়ে টুকরো জীবন্ত ফোকলোর।

মৌসুম শুরু হলেই এই এলাকা পরিণত হয় পর্যটকদের মিলনস্থলে। বরিশাল, ঢাকা, খুলনা, যশোর, বাগেরহাটসহ বিভিন্ন জেলা থেকে শত শত মানুষ ছুটে আসেন সবুজে মোড়া পেয়ারা বাগান দেখতে। ছুটির দিনে ভিড় থাকে সবচেয়ে বেশি।

ছোট নৌকা বা ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে পরিখা ঘুরে দেখা, নিজের হাতে গাছ থেকে পেয়োরা পাড়া এসব অভিজ্ঞতা ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এখন বিশেষ আকর্ষণ। অনেকেই স্মৃতি ধরে রাখতে সেলফি তোলেন; কেউ কেউ দম্পতিসহ পরিবার নিয়ে কাটান পুরো একটি দিন।

এখন ব্যক্তিগত উদ্যোগে আটঘর–কুড়িয়ানা অঞ্চলে গড়ে উঠেছে তিনটি মিনি পর্যটনকেন্দ্র , ফ্লোটিং পেয়ারা পার্ক, ন্যাচারাল টুরিজম অ্যান্ড পিকনিক স্পট ও রিয়ান পেয়ারা পার্ক। এসব পার্কে রয়েছে ওয়াচটাওয়ার, কাঠের ঝুলন্ত সেতু, শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা এবং নৌ-ভ্রমণের সুবিধা।

উপজেলা প্রশাসন বেশ কিছু নির্দেশনা জারি করায় বাগান ও নৌপথে শৃঙ্খলা অনেকটাই ফিরেছে বলে স্থানীয়দের মন্তব্য।

বাগানের প্রবীণ চাষিরা জানান, অন্তত দুই শতাব্দী ধরে এই এলাকায় পেয়ারা চাষ চলছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু হয়েছে গত প্রায় ৭৫–৮০ বছর আগে। কৃষি বিভাগের হিসেবে স্বরূপকাঠির আটঘর, কুড়িয়ানা, আদমকাঠিসহ ২৭টি গ্রামে প্রায় ৬০১ হেক্টর জমিতে পেয়ারার বাগান রয়েছে।

চাষাবাদ, পরিবহন, দালাল–পাইকার পরিচালনা, হাট ও বিপণন ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে প্রায় ৮ হাজার মানুষ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *