একসময় রুটি ছিল অভাবের নামান্তর। ভাত জুটত না বলেই মানুষ রুটি খেত। পছন্দে নয় প্রয়োজনেই। রুটি তখন ছিল ক্ষুধার সাক্ষ্য, দারিদ্র্যের নীরব দলিল। আজ সেই রুটি হয়ে গেছে সচেতনতার মুখোশ।
রুটি এখন আর অভাবের প্রতীক নয়; হয়েছে রুচি, ডায়েট আর তথাকথিত আধুনিকতার বিজ্ঞাপন। কেউ ডায়েটের অজুহাতে, কেউ অসুখের দোহাই দিয়ে, কেউ আবার আভিজাত্যের মোড়কে রুটি খায়। প্রশ্ন জাগে, তাহলে অভাব কোথায় হারাল?
আসলে মনে হয়, অভাব হারায়নি। শুধু রূপ বদলেছে। একসময় অভাব ছিল পেটের ভেতরে।
আজ অভাব বাসা বেঁধেছে মাথার ভেতরে। সেকালের মানুষের লড়াই ছিল ক্ষুধার সঙ্গে। একালের মানুষের যুদ্ধ ‘পেস্টিজ অব ইস্যু’ নিয়ে।
দেখাতে হবে আমরা কী খাই, কী পরি, কীভাবে বাঁচি। ফলে খাবার এখন আর ক্ষুধা নিবারণের বিষয় নয়।এটা হয়েছে অনেকটা সামাজিক অবস্থান জানান দেওয়ার নীরব বিজ্ঞাপন। আমার কথাটাগুলো নিয়ে যদি সন্দিহান হয়ে থাকেন একটু পাশের বাসার ভাই বা ভাবির দৈনন্দিন কথাগুলো শোনার অনুরোধ রইল।
তাদের কথাগুলোর একটু উদাহরন স্বরূপ বলি, ‘ভাই কেমন আছেন, বাজারে গিয়েছিলেন, দেখছেন মাছের কি দাম? কি করব ভাই চার কেজি শিং মাছ কিনলাম। নয়শত টাকা কেজি। ও ছোট মেয়েটা আবার শিং খায়না। সে একটু গরুর গোসত পছন্দ করে। গেলাম গোসতের দোকানে। গরুর মাংশর দাম শুনছেন, আটশ টাকা কেজি। মাত্র আড়াই কেজি কিনছি।’
কয়েকদিন আগে মাছ বাজারে গিয়ে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হলো। দেখলাম দুই বাল্যবন্ধু। একজন বেশ ধনাঢ্য, অন্যজন কোনোরকমে দিন চালায়। ধনী বন্ধু নির্দ্বিধায় তেরশ টাকা ধরে কিনল দুই কেজি চারশ গ্রাম আইর মাছ। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অপেক্ষাকৃত অসচ্ছল বন্ধুটি শুরুতে দাম করছিল সস্তা সাগরের ছোট মাছের। কিন্তু আইর মাছের থলে দেখে তার চোখে জ্বলে উঠল এক অদ্ভুত ক্ষুধা। পেটের নয়, মর্যাদার। পকেটের সব টাকা একত্র করে সে কিনে ফেলল এগারশ টাকা ধরে দেড় কেজি গলদা চিংড়ি।
সেই দৃশ্য দেখে মনে হলো। ক্ষুধা এখন আর শুধু পেটের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। ক্ষুধা আমাদের সমাজের বেশির ভাগ মানুষের সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে। আজ মানুষ খায় পেট ভরাতে নয়, মানুষ খায় দেখাতে। তাই রুটি এখন অভিজাতের প্রতীক। আর এই তথাকথিত অভিজাত হওয়ার দৌড়ে আটার দামও আকাশচুম্বী! অভাব তাই মুছে যায়নি। অভাব শুধু আরও চতুর, আরও ভদ্র, আরও ভয়ংকর হয়েছে।
হাবিবুল্লাহ মিঠু
সংবাদকর্মী
স্বরূপবার্তায় প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণই লেখকের নিজস্ব, এর দায়ভার স্বরূপবার্তা বহন করে না।
